কিছুদিন আগেই ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কাউকে রক্ষা করে না; বরং ইসরায়েলের জন্য সবাইকে কোরবানি দেয়।’ ইরানি স্পিকারের এই উক্তিকে আরও একবার প্রমাণ করল যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের ভয়ংকর ড্রোন হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষায় ইউক্রেন থেকে ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশে মোতায়েন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি এসব ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ২০০-র বেশি বিশেষজ্ঞও মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেশটি থেকে।
শুক্রবার (২০ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভ আজ শুক্রবার (২০ মার্চ) এক এক্স বার্তায় লিখেছেন, এই ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থাগুলো মূল অবকাঠামো সুরক্ষায় কাজ করছে। তিনি আরও জানান, এসব সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়ানোর কাজও চলছে।
ইউক্রেন আরও জানিয়েছে, তারা ২০০-র বেশি বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে, যাতে এসব দেশ ইরানের ড্রোন হামলা মোকাবিলা করতে পারে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইরানের ‘শাহেদ ধরনের ড্রোন, যেগুলো ২০২২ সালে রাশিয়াকে দেয়া হয়েছিল, একই ধরনের ড্রোন এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও ব্যবহার হচ্ছে।
তবে, ইউক্রেন এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে প্রায় ৯০ শতাংশ সফলতা পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা এখন তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের সঙ্গে ভাগাভাগি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো আগে মূলত বেশি উচ্চতায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। ফলে, নিচু উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ড্রোন মোকাবিলায় তারা দুর্বল ছিল।
ইউক্রেনের ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থায় খরচ অনেক কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালিস্টিক প্রতিরক্ষা মিসাইল একবার ছুঁড়তে প্রায় ১ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যেখানে একটি ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের খরচ প্রায় ৩ হাজার ডলার। আর একটি শাহেদ ড্রোনের আনুমানিক দাম প্রায় ৫০ হাজার ডলার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারকে হত্যা করে তারা। সেইসঙ্গে হত্যা করা হয় ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারকেও। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরানও। ২১ দিন ধরে চলমান এই হামলা-পাল্টা হামলায় ইতোমধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।
এরই মধ্যে ইরানের আগ্রাসী পদক্ষেপের মুখে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত সপ্তাহেই পূর্ব এশিয়ার বন্ধু দেশ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে নিজেদের টার্মিনাল হাই-অল্টিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থা সরিয়ে ইসরায়েলে স্থানান্তর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আকাশপথে সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে একরকম প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ গ্রহণের খবর প্রকাশ হতেই জাপান সাগরে পর পর ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। শুক্রবার (১৩ মার্চ) স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে রাজধানী পিয়ংইয়ং-এর কাছাকাছি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয় বলে জানায় জাপানের কোস্টগার্ড বাহিনী এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী।
গত দুই দশক ধরেই জাপান সাগর, পূর্ব চীন সাগর ও কোরিয়া প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করছে পিয়ংইয়ং। বেপরোয়াভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কারণে ২০০৬ জালে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে জাতিসংঘ, কিন্তু পিয়ংইয়ংকে দমানো যায়নি। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ বছর আগে দেশটিতে থাড মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে, সম্প্রতি ওয়াশিংটন সিউল-কে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে থাড।
গত ১৩ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক জুনআং এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। আর জুনআং-এ এই প্রতিবেদন প্রকাশের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই জাপান সাগরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার নির্দেশ দেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।
আরটিভি/এসএইচএম




